Bong Long Reader

Bong Long Reader

❂❂❂ Free Book Library ❂❂❂

(329 Items)

অতীতের ছবি-সুকুমার রায়

১

 

ছিল এ-ভারতে এমন দিন

মানুষের মন ছিল স্বাধীন;

সহজ উদার সরল প্রাণে

বিস্ময়ে চাহিত জগত পানে।

আকাশে তপন তারকা চলে,

নদী যায় ভেসে, সাগর টলে,

বাতাস ছুটিছে আপন কাজে,

পৃথিবী সাজিছে নানান্ সাজে;

ফুলে ফলে ছয় ঋতুর খেলা,

কত রূপ কত রঙের মেগা;

মুখরিত বন পাখির গানে,

অটল পাহাড় মগন ধ্যানে;

নীলাকাশে ঘন মেঘের ঘটা,

তাহে ইন্দ্রধনু বিজলী ছটা,

তাহে বারিধারা পড়িছে ঝরি–

দেখিত মানুষ নয়ন ভরি।

কোথায় চলেছে কিসের টানে

কোথা হতে আসে, কেহ না জানে।

ভাবিত মানব দিবস-যামী,

ইহারি মাঝারে জাগিয়া আমি,

কিছু নাহি বুঝি কিছু না জানি,

দেখি দেখি আর অবাক মানি।

কেন চলি ফিরি কিসের লাগি

কখন ঘুমাই কখন জাগি,

কত কান্না হাসি দুখে ও সুখে

ক্ষুধা তৃষ্ণা কত বাজিছে বুকে।

জন্ম লভি জীব জীবন ধরে,

কোথায় মিলায় মরণ পরে?

ভাবিতে ভাবিতে আকুল প্রাণে

ডুবিত মনিব গভীর ধ্যানে।

অকূল রহস্য তিমিরতলে,

জ্ঞানজ্যোতির্ময় প্রদীপ জ্বলে,

সমাহিত চিতে যতন করি

চলেছে একেরই শাসন মানি,

লোকে লোকান্তরে একেরই বাণী।

এক সে অমৃতে হয়েছে হারা

নিখিল জীবন-মরণ ধারা।

সে অমৃতজ্যোতি আকাশ ঘেরি,

অন্তরে বাহিরে অমৃত হেরি।

যাঁহা হতে জীব জনম লভে,

যাঁহা হতে ধরে জীবন সবে,

যাঁহার মাঝারে মরণ পরে

ফিরি পুন সবে প্রবেশ করে

তাঁহারে জানিবে যতন ধরি

তিনি ব্রহ্ম তাঁরে প্রণাম করি।

আনন্দেতে জীব জনম লভে

আনন্দে জীবিত রয়েছে সবে;

আনন্দে বিরাম লভিয়া প্রাণ

আনন্দের মাঝে করে প্রয়াণ।

শুন বিশ্বলোক, শুনহ বাণী

অমৃতের পুত্র সকল প্রাণী,

দিব্যধামবাসী শুনহ সবে–

জেনেছি তাঁহারে, যিনি এ ভবে

মহান পুরুষ, নিখিল গতি,

তমসার পরে পরম জ্যোতি;

তেজোময় রূপ হেরিয়া তাঁরে

স্তব্ধ হয় মন, বচন হারে।

বামে ও দখিনে উপরে নীচে,

ভিতরে বাহিরে, সমুখে পিছে,

কিবা জলেস্থলে আকাশ পরে,

আঁধারে আলোকে চেতনে জড়ে;

আমার মাঝারে, আমারে ঘেরি

এক ব্রহ্মময় প্রকাশ হেরি।

সে আলােকে চাহি আপন পানে

আপনারে মন স্বরূপ জানে।

আমি আমি করি দিবস-যামী,

না জানি কেমন কোথা সে ‘আমি’।

অচঞ্চল শিখা সে আলাে ধরি

দিব্য জ্ঞানময় নয়ন লভি,

হেরিল নূতন জগত ছবি।

অনাদি নিয়মে অনাদি স্রোতে

ভাসিয়া চলেছে অকূল পথে

প্রতি ধূলিকণা নিখিল টানে

এক হতে ধায় একেরই পানে

অজয় অমর অরূপ রূপ

নহি আমি এই জড়ের স্তূপ,

দেহ নহে মাের চির-নিবাস

দেহের বিনাশে নাহি বিনাশ।

বিশ্ব আত্মা মাঝে হয়ে মগন

আপন স্বরূপ হেরিলে মন

না থাকে সন্দেহ না থাকে ভয়

শোক তাপ মােহ নিমেষে লয়,

জীবনে মরণে না রহে ছেদ,

ইহ-পরলােকে না রহে ভেদ।

ব্রহ্মানন্দময় পরম ধাম,

হেথা আসি সবে লভে বিরাম;

পরম সম্পদ পরম গতি,

লভ তাঁরে জীব যতনে অতি।

 

২

 

কালচক্রে হায় এমন দেশে

ঘোর দুঃখদিন আসিল শেষে।

দশদিক হতে আঁধার আসি

ভারত আকাশ ফেলিল গ্রাসি।

কোথা সে প্রাচীন জ্ঞানের জ্যোতি,

সত্য অন্বেষণে গভীর মতি;

কোথা ব্রহ্মজ্ঞান সাধন ধন,

কোথা ঋষিগণ ধ্যানে মগন;

কোথা ব্রহ্মচারী তাপস যত,

কোথা সে ব্রাহ্মণ সাধনা রত?

একে একে সবে মিলাল কোথা,

আর নাহি শুনি প্রাচীন কথা।

মহামূল্য নিধি ঠেলিয়া পায়

হেলায় মানুষ হারাল তায়।

আপন স্বরূপ ভুলিয়া মন

ক্ষুদ্রের সাধনে হল মগন।

ক্ষুদ্র চিন্তা মাঝে নিয়ত মজি,

ক্ষুদ্র স্বার্থ-সুখ জীবনে ভজি;

ক্ষুদ্র তৃপ্তি লয়ে মূঢ়ের মতাে

ক্ষুদ্রের সেবায় হইল রত।

রচি নব নব বিধি-বিধান

নিগড়ে বাঁধিল মানব প্রাণ;

সহস্র নিয়ম নিষেধ শত,

তাহে বদ্ধ নর জড়ের মত;

লিখি দাসখত ললাটে তার

রুদ্ধ করি দিল মনের দ্বার।

জ্বলন্ত যাঁহার প্রকাশ ভবে

হায় রে তাঁহারে ভুলিল সবে;

কল্পনার পিছে ধাইল মন,

কল্পিত দেবতা হইল সৃজন,

কল্পিত রূপের মুরতি গড়ি,

মিথ্যা পূজাচার রচন করি,

ব্যাখ্যা করি তার মহিমা শত,

মিথ্যা শাস্ত্রবাণী রচিল কত।

তাহে তপ্ত হয়ে অবোধ নরে

রহে উদাসীন মােহের ভরে

না জাগে জিজ্ঞাসা অলস মনে,

দেখিয়া না দেখে পরম ধনে।

ব্রাহ্মণেরে লোকে দেবতা মানি

নির্বিচারে শুনে তাহারি বাণী।

পিতৃপুরুষের প্রসাদ বরে

বসি উচ্চাসনে গরব ভরে

পূজা-উপচার নিয়ত লভি

ভুলিল ব্রাহ্মণ নিজ পদবী।

কিসে নিত্যকাল এ ভারতভবে

আপন শাসন অটুট রবে

এই চিন্তা সদা করি বিচার

হল স্বার্থপর হাদয় তার।

ভেদবুদ্ধিময় মানব মন

নব নব ভেদ করে সৃজন।

জাতিরে ভাঙিয়া শতধা করে,

তাহার উপরে সমাজ গড়ে;

নানা বর্ণ নানা শ্রেণী বিচার,

নানা কূটবিধি হল প্রচার।

ভেদ বুদ্ধি কত জীবন মাঝে

অশনে বসনে সকল কাজে,

ধর্ম অধিকারে বিচার ভেদ

মানুষে মানুষে করে প্রভেদ।

ভেদ জনে জনে, নারী ও ঘরে,

জাতিতে জাতিতে বিচার ঘরে।

মিথ্যা অহংকারে মােহের বশে

জাতির একতা বাঁধন খসে;

হয়ে আত্মঘাতী ভারতভবে

আপন কল্যাণ ভুলিল সবে।

 

৩

 

এখনাে গভীর তমসা রাতি,

ভারত ভবনে নিতেছে বাতি–

মানুষ না দেখি ভারতভূমে,

সবাই মগন গভীর ঘুমে।

কত জাতি আজ হেলার ভরে

হেথায় আসিয়া বসতি করে।

ভারতের বুকে নিশান গাঁথি

বসেছে সবলে আসন পাতি।

নিজ ধনবান নিজ বিভব

বিদেশীর হাতে সঁপিয়া সব,

ভারতের মুখে না ফুটে বাণী,

মৌন রহে দেশ শরম মানি।

–হেনকালে শুন ভেদি আঁধার

সুগম্ভীর বাণী উঠিল কার–

“ভাব সেই একে ভাবহ তাঁরে,

জলে স্থলে শূন্যে হেরিছ যাঁরে;

নিয়ত যাঁহার স্বরূপ ধ্যানে

দিব্য জ্ঞান জাগে মানব প্রাণে।

ছাড় তুচ্ছ পূজা জড়-সাধন,

মিথ্যা দেবসেবা ছাড় এখন;

বেদান্তের বাণী স্মরণ কর,

ব্রহ্মজ্ঞান-শিখা হৃদয়ে ধর।

সত্য মিথ্য দেথ করি বিচার

খুলি দাও যত মনের দ্বার।

মানুষের মতাে স্বাধীন প্রাণে

নির্ভয়ে তাকাও জগত পানে–

দিকে দিকে দেখ ঘুচিছে রাতি,

দিকে দিকে জাগে কত না জাতি;

দিকে দিকে লােক সাধনারত

জ্ঞানের ভাণ্ডার খুলেছে কত।

নাহি কি তােমার জ্ঞানের খনি।

বেদান্ত-রতন মুকুটমণি?

অসারে মজে কি ভুলেছ তুমি

ধর্মে গরীয়ান ভারতভূমি?”

–শুনি মৃতদেশ পরান পায়,

বিস্ময়ে মানুষ ফিরিয়া চায়।

দেখে দিব্যরূপ পুরুষবরে

কান্তি তেজোময় নয়ন হরে,

সবল শরীর সুঠাম অতি,

ললাট প্ৰসর, নয়নে জ্যোতি,

গম্ভীর স্বভাব, বচন ধীর,

সত্যের সংগ্রামে অজেয় বীর;

অতুল প্রখর প্রতিভাবরে

নানা শাস্ত্র ভাষা বিচার করে।

রামমোহনের[রামমোহন রায়] জীবন স্মরি,

কৃতজ্ঞতা ভরে প্রণাম করি।

দেশের দুর্গতি সকলখানে

হেরিয়া বাজিল রাজার প্রাণে।

কত অসহায় অবােধ নারী

সতীত্বের নামে সকল ছাড়ি,

কেহ স্ব-ইচ্ছায়, কেহ-বা ভয়ে,

শাসনে-তাড়নে পিষিত হয়ে,

পতির চিতায় পুড়িয়া মরে–

শুনি কাঁদে প্রাণ তাদের তরে।

নারীদুঃখ নাশ করিল পণ,

ঘুচিল নারীর সহমরণ।

নিষ্কাম করম-যােগীর মতো

দেশের কল্যাণ সাধনে রত,

নানা শাস্ত্রবাণী করে চয়ন,

দেশ-দেশান্তের ঋষিবচন;

পশ্চিমের নব জ্ঞানের বাণী

দেশের সমুখে ধরিল আনি।

কিরূপেতে পুন এ ভারতভবে

ব্রহ্মজ্ঞান কথা প্রচার হবে,

নিয়ত যতন তাহারি তরে,

কত শ্রম কত প্রয়াস করে;

তর্ক আলোচনা, কত বিচার

কত গ্রন্থ রচি করে প্রচার;

—ক্রমে বিনাশিতে জড়-ধরম

“ব্রহ্ম সমাজে’র হল জনম!

শুনে দেশবাসী নূতন কথা,

মুরতিবিহীন পূজার প্রথা;

উপাসনা-গৃহ দেখে নূতন

যেথায় স্বদেশী-বিদেশী জন

শূদ্র দ্বিজ আদি মিলিয়া সবে

নির্বিচারে সবে আসন লভে।

মহাপুরুষের বিপুল শ্রমে

দেশে যুগান্তর আসিল ক্রমে।

স্বদেশের তরে আকুল প্রাণ

প্রবাসেতে রাজা করে প্রয়াণ;

সেথায় সুদূর বিলাতে হায়

অকালেতে রাজা ত্যজিল কায়।

অসমাপ্ত কাজ রহিল পড়ে,

ফিরে যায় লােকে নিরাশা ভরে;

একে একে সব যেতেছে চলে–

ভাসে রামচন্দ্র[রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশ] নয়নজলে।

রাজার জীবন নিয়ত স্মরি’

উপাসনা-গৃহে রহে সে পড়ি,

নিয়ম ধরিয়া পূজার কালে

নিষ্ঠাভরে সেথা প্রদীপ জ্বালে।

একা বসি ভাবে, রাজার কাজ

এমন দুদিনে কে লবে আজ?

 

৪

 

ধনী যুবা এক শ্মশান ঘাটে

একা বসি তার রজনী কাটে।

অদূরে অন্তিম শয়নােপরি

দিদিমা তাহার আছেন পড়ি,

সমুখে পূর্ণিমা গগনতলে,

পিছনে শ্মশানে আগুন জ্বলে,

তাহারি মাঝারে নদীর তীরে

হরিনাম ধ্বনি উঠিছে ধীরে।

একাকী যুবক বসিয়া কূলে।

সহসা কি ভাবি আপনা ভুলে।

প্রসন্ন আকাশ চাঁদিম রাতি

ধরিল অপূর্ব নূতন ভাতি,

তুচ্ছ বােধ হল ধন-বিভব

বিলাস বাসনা অসার সব,

অজানা কি যেন সহসা স্মরি

পলকে পরান উঠিল ভরি।

আর কি সে মন বিরাম মানে?

গভীর পিপাসা জাগিল প্রাণে।

কোথা শান্তি পাবে ব্যাকুল তৃষা

শুধায় সবারে না পায় দিশা।

–সহসা একদা তাহার ঘরে

ছিন্নপন্ন এক উড়িয়া পড়ে;

কি যেন বচন লিখিত তায়

অথ তার যুবা ভাবি না পায়।

বিদ্যাবাগীশের নিকটে তবে

যুবা সে বাণীর মরম লভে–

“যাহা কিছু এই জাগততলে

অনিত্যের স্রোতে ভাসিয়া চলে

ব্রহ্মে আচ্ছাদিত জানিবে তায়”–

শুনিয়া যুবক প্রবোধ পায়।

শুনি মহাবাণী চমক লাগে,

আরো জানিবারে বাসনা জাগে;

ব্রহ্মজ্ঞান লাভে পিপাসু মন

গভীর সাধন হল মগন;

যত ডোবে আরো ডুবিতে চায়–

ডুবি নব নব রতন পায়।

হেনকালে হল অশনিপাত–

যুবকের পিতা দ্বারকানাথ,

অতুল সম্পদ ধন বিভব

ঋণের পাথারে ডুবায়ে সব

কিছু না বুঝিত জানিতে কেহ

অকালে সহসা ত্যঞ্জিল দেহ।

আত্মীয়-স্বজন কহিল সবে,

“যে উপায়ে হােক বাঁচিতে হবে–

কর অস্বীকার ঋণের দায়

নহিলে তােমার সকলি যায়।”

নাহি টলে তায় যুবার মন,

পিতৃঋণ শোধ করিল পণ,

হয়ে সর্বত্যাগী ফকির দীন

ছাড়ি দিলে সব শােবিতে ঋণ।

উত্তমর্ণজনে অবাক মানি

কহে শ্রদ্ধাভরে অভয় বাণী,

“বিষয় বিভব থাকুক তব,

মােরা তাহা হতে কিছু না লব।

সাধুতা তােমার তুলনাহীন;

সাধ্যমতাে তুমি শুধিয়া ঋণ।”

বরষের পরে বরষ যায়,

যুবক এখন প্রবীণ-প্রায়।

সংসারে বাসনা-বিগত মন,

ঋষিকল্পরূপ ধ্যানে মগন,

ব্রহ্ম-ধ্যান-জ্ঞানে পূরিত প্রাণ,

ব্ৰহ্মানন্দ রস করিছে পান;

বচনেতে যেন অমৃত ঝরে–

নমি নমি তারে ভকতি ভরে।

ব্রাহ্মসমাজের আসন হতে

দীপ্ত অগ্নিময় বচন স্রোতে

ব্ৰহ্মজ্ঞান ধারা বহিয়া যায়,

কত শত লােকে শুনিতে ধায়।

“ব্রহ্মে কর প্রীতি নিয়ত সবে,

প্রিয়কার্য তাঁর সাধহ ভবে।

হের তারে নিজ হৃদয় মাঝে,

সেথা ব্রহ্মজ্যোতি নিয়ত রাজে।

জ্ঞানসমুজ্জ্বল বিমল প্রাণে,

যে জানে তাহারে ধ্ৰুব সে জানে।

জানিবার পথ নাহিক আর,

নহে শাস্ত্রবাণী প্রমাণ তার।

বহু তর্ক বহু বিচার বলে

বহু জপ তপ সাধন ফলে

বহু তত্ত্বকথা আলােড়ি চিতে

নাহি পায় সেই বচনাতীতে।”

ব্রাহ্মসমাজের অসাড় প্রাণে,

মহর্ষির[দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর] বাণী চেতনা আনে।

দলে দলে লােক সেথায় ছোটে

উৎসাহের স্রোতে আসিয়া জোটে।

মত্ত অনুরাগে কেশব[কেশবচন্দ্র সেন] ধায়,

প্রতিভার জ্যোতি নয়নে ভায়;

আকুল আহে পরান খুলি

ঝাঁপ দিল স্রোতে আপনা ভুলি।

হেরি মহর্ষির পুলক বাড়ে,

“ব্রহ্মানন্দ” নাম দিলেন তারে।

লভি নব প্রাণ সমাজ-কায়

নব নব ভাবে বিকাশ পায়;

ধর্মগ্রন্থ নব নব সাধন,

ব্ৰহ্ম উপাসনা বিধি নূতন,

ধর্মপ্রাণ কত নারী ও নরে

তাহে নিমগন পুলক ভরে।

 

৫

 

সমাজে সুদিন এল আবার,

ক্রমে প্রসরিল জীবন তার।

কেশব আপন প্রতিভা বলে

যতনে গঠিল যুবকদলে।

নগরে নগরে হল প্রচার–

“ধর্মরাজ্যে নাহি জাতিবিচার;

নাহি ভেদ হেথা নারী ও নরে,

ভক্তি আছে যার সে যায় ত’রে।

জাতিবর্ণ-ভেদ কুরীতি যত

ভাঙি দাও চিরদিনের মতাে।

দেশ-দেশান্তরে ধাউক মন,

সর্বধর্মবাণী করো চয়ন;

ধর্মে ধর্মে নাহি বিরোধ রবে,

মহা সমন্বয় গঠিত হবে!”

পশিল সে বাণী দেশের প্রাণে,

মুগ্ধ নরনারী অবাক মানে!

নগরে নগরে তুফান উঠে,

ঘরে ঘরে কত বাঁধন টুটে;

ব্রহ্ম নামে সবে ছুটিয়া চলে,

প্রাণ হতে প্রাণে আগুন জ্বলে।

আসিল গোঁসাই[বিজয়কৃষ্ণ গােস্বামি] ব্যাকুল হয়ে

প্রেমে ভরপুর ভকতি লয়ে।

আসিল প্রতাপ[প্রতাপচন্দ্র মজুমদার] স্বভাব ধীর,

গম্ভীর বচন জ্ঞানে গভীর।

স্বল্পভাষী সাধু অঘোরনাথ[অঘােরনাথ গুপ্ত]

যোগমগ্ন মন দিবসরাত। 

গৌরগােবিন্দের[গৌরগােবিন্দ রায়] সাধক প্রাণ

হিন্দুশাস্ত্রে তাঁর অতুল জ্ঞান।

কান্তিচন্দ্র[কান্তিচন্দ্র মিত্র] সদা সেবায় রত

সেবাধর্ম তাঁর জীবন-ব্রত।

ত্রৈলােক্যনাথের[ত্রৈলোক্যনাথ সান্যাল] সরস গান

নব নব ভাবে মাতায় প্রাণ।

আরাে কত সাধু ধরমমতি

বঙ্গচন্দ্র[বঙ্গচন্দ্র রায়] আদি প্রচার-ব্রতী

একসাথে মিলি প্রেমের ভরে

প্রেমপরিবার গঠন করে।

কাল কিবা খাবে কেহ না জানে,

আকুল উৎসাহ সবার প্রাণে।

নূতন মন্দির নব সমাজ

নব ভাবে কত নূতন কাজ।

দিনে দিনে নব প্রেরণা পায়,

উৎসাহের স্রোত বাড়িয়া যায়।

সমাজ-চালনা বিধি-বিচার

কেশবের হাতে সকল ভার;

কেশবপ্রেরণা সবার মূলে

তাঁর নামে সবে আপনা ভুলে।

ধন্য ব্রহ্মানন্দ যাঁহার বাণী

শিরে ধরে লোকে প্রমাণ মানি।

যাঁহার সাধনা আজিও হেরি

রয়েছে সমাজ জীবন ঘেরি;

যাঁহার মুরতি স্মরণ করি,

যাঁহার জীবন হৃদয়ে ধরি,

শত শত লােক প্রেরণা পায়–

আজি ভক্তিভরে প্রণমি তায়।

আবার বহিল নূতন ধারা,

সমাজের প্রাণে বাজিল সাড়া;

ভাসি বহুজনে সে নব স্রোতে

বাহির হইল নূতন পথে।

মিলি অনুরাগে যতন ভরে

এই ‘সাধারণ’ সমাজ গড়ে।

ওদিকে কেশব নূতন বলে

বাধিল আবার আপন দলে।

নব ভাবে ‘নববিধান’ গড়ি,

নূতন সংহিতা রচনা করি,

ভগ্নদেহ লয়ে অবশপ্রায়,

খাটিতে খাটিতে ত্যজিল কায়।

 

৬

 

ধরি নব পথ নূতন ধারা

নবীন প্রেরণে আসিল যারা

আজি তাঁহাদের চরণ ধরি

ভক্তিভরে সবে স্মরণ করি।

শাস্ত্রী শিবনাথ সকল ফেলি

বিষয় বাসনা চরণে ঠেলি

বহু নির্যাতন বহিয়া শিরে,

অনুরাগে ভাসি নয়ন নীরে,

সর্বত্যাগী হয়ে ব্যাকুল প্রাণে

ছুটে আসে ঐ কিসের টানে?

দেখ এই চলে পাগলমতো

ভক্তশ্রেষ্ঠ বীর বিনয়নত,

বিজয় গোঁসাই সরল প্রাণ–

হেরি আজি তাঁর প্রেম বয়ান।

সাধু রামতনু[রামতনু লাহিড়ী] জ্ঞানে প্রবীণ

শিশুর মতন চির নবীন।

শিবচন্দ্র দেব সুধীর মন,

কর্মনিষ্ঠায় সাধু জীবন।

নগেন্দ্রনাথের[নগেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়] যুকতি বাণে

কূট তর্ক যত নিমেষে হানে।

আনন্দমােহন[আনন্দমোহন বসু] প্রেমে উদার

আনন্দ মােহন মূরতি যার।

উমেশচন্দ্রের[উমেশচন্দ্র দত্ত] জীবন মন,

নীরব সাধনে সদা মগন।

দুর্গামােহনের[দুর্গামােহন দাস] জীবনগত

সমাজের সেবা দানের ব্রত।

দ্বারকানাথের[দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়] স্মরণ হয়

ন্যায়ধর্মে বীর অকুতোভয়।

পূর্ববঙ্গে হোথা সাধক কত

নবধর্মবাণী প্রচারে রত।

সংসারে নির্লিপ্ত ভাবুক প্রাণ

সার্থক প্রচারে কালীনারা’ণ[কালীনারায়ণ গুপ্ত]–

কত নাম কব, কত যে জ্ঞানী,

কত ভক্ত সাধু যােগী ও ধ্যানী;

কত মধুময় প্রেমিক মন,

আড়ম্বরহীন সেবকজন;

আসিল হেথায় আকাশ ভরে

সবার যতনে সমাজ গড়ে।

এই যে মন্দির, হেরিছ যার

ইঁটকাঠময় স্থূল আকার;

ইহারই মাঝারে কত যে স্মৃতি,

কত অকিঞ্চন সমাজপ্রীতি,

ব্যাকুল ভাবনা দিবসরাত

বিনিদ্র সাধনে জীবনপাত।

বহু কর্মময় এই সমাজ,

সে সব কাহিনী না কব আজ,–

আজিকে কেবল স্মরণে আনি

ব্রাহ্মসমাজের মহান বাণী।

যে বাণী শুনিনু রাজার মুখে,

মহর্ষি যাহারে ধরিল বুকে,

কেশব যে বাণী প্রচার করে–

স্মরি আজ তাহা ভকতি ভরে।

রক্তাক্ষরে লিখা যে-বাণী রটে

এই সমাজের জীবনপটে–

“স্বাধীন মানবহৃদয়তলে–

বিবেকের শিখা নিয়ত জ্বলে।

গুরুর আদেশ সাধুর বাণী

ইহার উপরে কারে না মানি।”

স্বাধীন মনের এই সমাজ

মুক্ত ধৰ্মলাভ ইহার কাজ।

হেথায় সকল বিরোধ ঘুচি

রবে নানা মত নানান্ রুচি,

কাহারাে রচিত বিধি বিধান

রুধিবে না হেথা কাহারাে প্রাণ।

প্রতি জীবনের বিবেক ভাতি

সবার জীবনে জ্বলিবে বাতি।

নরনারী হেথা মিলিয়া সবে

সম অধিকারে আসন লভে।

‘প্রেমেতে বিশাল, জ্ঞানে গভীর

চরিত্রে সংযত, করমে বীর;

ঈশ্বরে ভকতি, মানবে প্রীতি,’–

হেথা মানুষের জীবন নীতি।

ফুরাল কি সব হেথায় আসি?

আসিবে না প্রেম জড়তা নাশি?

জাগিবে না প্রাণ ব্যাকুল হয়ে,

নব নব বাণী জীবনে লয়ে?

জ্বলিবে না নব সাধন শিখা?

নব ইতিহাস হবে না লিখা?

চিররুদ্ধ রবে পূজার দ্বার?

আসিবে না নব পূজারি আর?

কোথাও আশার আলো কি নাহি?

শুধাই সবার বদন চাহি।

error: Content is protected !!
Scroll to Top