কানা-খোঁড়া সংবাদ
(সুকুমার রায়)
পুরাতন কালে
ছিল দুই রাজা,
নাম-ধাম নাহি জানা,
একজন তার
খোঁড়া অতিশয়,
অপর ভূপতি কানা।
মন ছিল খোলা,
অতি আলাভোলা,
ধরমেতে ছিল মতি,
পরধনে সদা
ছিল দোঁহাকার
বিরাগ বিকট অতি!
প্রতাপের কিছু
নাহি ছিল ত্রুটি,
মেজাজ রাজারই মতো,
শুনেছি কেবল
বুদ্ধিটা নাকি
নাহি ছিল সরু তত।
তাই ভাই মতাে
ছিল দুই রাজা,
না ছিল ঝগড়াঝাঁটি
হেনকালে আসি
তিন হাত জমি
সকল করিল মাটি।
তিন হাত জমি
হেন ছিল তাহা
কেহ নাহি জানে কার,
কহে খোঁড়া রায়,
এক চক্ষু যার
এ জমি হইবে তার।”
শুনি কানা রাজা
ক্ৰোধ করি কয়,
“আরে অভাগার পুত্র।
এ জমি তােমারই
দেখ-না এখনি,
খুলিয়া কাগজপত্র।”
নকশা রেখেছে
একশো বছর
বাক্সে বাঁধিয়া আঁটি,
কীট ফুটমতি
কার্টিয়া কাটিয়া
করিয়াছে তারে মাটি;
কাজেই তর্ক
না মিটিল হায়,
বিরােধ বাধিল ভারি,
হইল যুদ্ধ
হদ্দ মতন
চৌদ্দ বছর ধরি।
মরিল সৈন্য,
ভাঙিল অস্ত্র,
রক্ত চলিল বহি,
তিন হাত জমি
তেমনি রহিল,
কারও হারজিৎ নাহি।
তবে খোঁড়া রাজা
কহে, “হায়, হায়,
তর্ক বিষম বটে,
ঘোরতর রণে
অতি অকারণে,
মরণ সবার ঘটে।”
বলিতে বলিতে
চটাৎ করিয়া
হঠাৎ মাথায় তার
অদ্ভুত এক
বুদ্ধি আসিল
অতীব চমৎকার।
কহিল তখন
খোঁড়া মহারাজ,
“শুন মোর কানা ভাই,
তুচ্ছ কারণে
রক্ত ঢালিয়া
কখনাে সুযশ নাই।
তার চেয়ে জমি
দান করে ফেল
আপদ শান্তি হবে।”
কানা রাজা কহে,
“খাসা কথা ভাই
কারে দিই কহ তবে।”
কহেন খঞ্জ,
“আমার রাজ্যে
আছে তিন মহাবীর
একটি পেটুক,
অপর অলস
তৃতীয় কুস্তিগীর।
তােমার মুলুকে
কে আছে এমন
এদের হারাতে পারে?–
সবার সমুখে|
তিন হাত জমি
বখসিস্ দিব তারে।”
কানা রাজা কহে,
“ভীমের দোসর
আছে তো মম্ল মম,
ফলাহারে পটু
পঁচাশি পেটুক
অলস কুমড়াসম।
দেখা যাবে কার
বাহাদুরি বেশি
আসুক তোমার লোক;
যে জিতিবে সেই
পাবে এই জমি”–
খোঁড়া বলে, “তাই হোক।”
পড়িল নােটিস
ময়দান মাঝে
আলিশান সভা হবে,
তামাশা দেখিতে
চারিদিক হতে
ছুটিয়া আসিল সবে।
ভয়নিক ভিড়ে
ভরে পথ ঘাট,
লোকে হল লোকাকার,
মহা কোলাহল,
দাঁড়াবার ঠাঁই
কোনোখানে নাহি আর।
তার পর ক্রমে
রাজার হুকুমে
গােলমাল গেল থেমে,
দুই দিক হতে
দুই পালোয়ান
আসরে আসিল নেমে।
লম্ফে ঝম্ফে
যুঝিল মন্ত্র
গজকচ্ছপ হেন।
রুষিয়া মুষ্টি
হানিল দোঁহায়–
বজ্র পড়িল যেন।
গুঁতাইল কত,
ভোঁতাইল নাসা
উপাড়িল গোঁফদাড়ি,
যতেক দন্ত
করিল অন্ত
ভীষণ চাপট মারি।
তার পরে দোঁহে
দোঁহারে ধরিয়া
ছুঁড়িল এমনি জোরে,
গোলার মতন
গেল গো উড়িয়া
দুই বীর বেগভরে।
কি হল তাদের
কেহ নাহি জানে
নানা কথা কয় লােকে,
আজও কেহ তার
পায় নি খবর
কেহই দেখে নি চোখে।
যাহােক এদিকে,
কুস্তির শেষে |
এল পেটুকের পালা,
যেন অতিকায়
ফুটবল দুটি,
অথবা ঢাকাই জালা।
ওজনেতে তারা
কেহ নহে কম
ভোজনেতে ততােধিক,
বপু সুবিপুল,
ভুঁড়ি বিভীষণ–
ভারী সাতমণ ঠিক।
অবাক দেখিছে
সভার সকলে
আজব কাণ্ড ভারি–
ধামা ধামা লুচি
নিমিষে ফুরায়
দই ওঠে হাঁড়ি হাঁড়ি।
দাঁড়িপাল্লায়
মাপিয়া সকলে
দেখে আহারের পরে,
দুজনেই ঠিক
বেড়েছে ওজনে
সাড়ে তিনমণ করে।
কানা রাজা বলে,
“এ কি হল জ্বালা,
আক্কেল নাহি কারও,
কেহ কি বােঝে না,
সােজা কথা এই–
হয় জেতো, নয় হারো।”
তার পর এল
কুঁড়ে দুইজন
ঝাঁকার উপরে চড়ে,
সভামাঝে দোঁহে
শুয়ে চিৎপাত
চুপচাপ রহে পড়ে।
হাত নাহি নাড়ে,
চোখ নাহি মেলে,
কথা নাহি কারও মুখে,
দিন দুই তিন
রহিল পড়িয়া
নাসাগীত গাহি সুখে।
জঠরে যখন
জ্বলিল আগুন
পরান কন্ঠাগত,
তখন কেবল
মেলিয়া আনন
থাকিল মড়ার মতাে।
দয়া করে তবে
সহৃদয় কেহ
নিকটে আসিয়া ছুটি,
মুখের নিকটে
ধরিল তাদের
চার্টিম কদলী দুটি।
খঞ্জের লােকে
কহিল কষ্টে,
“ছাড়িয়ে দেনা রে ভাই,”
কানার ভৃত্য
রহিল হাঁ করে,
মুখে তার কথা নাই।
তখন সকলে
কাষ্ঠ আমিয়া
তায় কেরোসিন ঢালি,
কুঁড়েদের গায়ে
চাপাইয়া রোষে
দেশলাই দিল জ্বালি।
খোঁড়ার প্রজাটি
“বাপ রে!” বলিয়া
লাফ দিয়া তাড়াতাড়ি,
কম্পিতপদে
চম্পট দিল
একেবারে সভা ছাড়ি।
‘দুয়াে’ বলি সবে
দেয় করতালি,
পিছু পিছু ডাকে ‘ফেউ’
কানার অলস
বলে, “কি আপদ।”
ঘুমুতে দিবি নে কেউ?”
শুনে সবে বলে,
“ধন্য ধন্য!
কুঁড়ে-কুল-চূড়ামণি!”
ছুটিয়া তাহারে
বাহির করিল
আগুন হইতে টানি।
কানার লোকের
গুণপনা দেখে
কানা রাজা খুশি ভারি,
জমি তো দিলই
আরাে দিল কত,
টাকাকড়ি, ঘরবাড়ি।
সন্দেশ(কার্তিক, ১৩২৭)
।। সমাপ্তি।।