কিম্ভূত
(সুকুমার রায়)
বিদঘুটে জানোয়ার কিমাকার কিম্ভূত,
সারাদিন ধ’রে তার শুনি শুধু খুঁৎ খুঁৎ।
মাঠপারে ঘাটপারে কেঁটে মরে খালি সে,
ঘ্যান্ ঘ্যান্ আবদারে ঘন ঘন নালিশে।
এটা চাই সেটা চাই কত তার বায়না—
কি যে চায় তাও ছাই বোঝা কিছু যায় না।
কোকিলের মত তার কণ্ঠেতে সুর চাই,
গলা শুনে আপনার বলে, “উঁহু, দূর ছাই!’
আকাশেতে উড়ে যেতে পাখিদের মানা নেই—
তাই দেখে মরে কেঁদে—তার কেন ডানা নেই!
হাতিটার কী বাহার দাঁতে আর শুণ্ডে—
ও রকম জুড়ে তার দিতে হবে মুণ্ডে!
কাঙ্গারুর লাফ দেখে ভারি তার হিংসে—
ঠ্যাং চাই আজ থেকে ঢ্যাংঢেঙে চিমসে!
সিংহের কেশরের মত তার তেজ কৈ?
পিছে খাসা গোসাপের খাঁজকাটা লেজ কৈ?
একলা সে সব হ’লে মেটে তার প্যাখনা;
যারে পায় তারে বলে, “মোর দশা দেখ না!”
কেঁদে কেঁদে শেষটায়—আষাঢ়ের বাইশে
হ’ল বিনা চেষ্টায় চেয়েছে যা তাই সে।
ভুলে গিয়ে কাঁদাকাটি আহ্লাদে আবেশে
চুপিচুপি এলাকাটি ব’সে ব’সে ভাবে সে—
লাফ দিয়ে হুশ্ করে হাতি কভু নাচে কি?
কলাগাছ খেলে পরে কাঙ্গারুটা বাঁচে কি?
ভোঁতামুখে কুহুডাক শুনে লোকে কবে কি?
এই দেহে শুঁড়ো নাক খাপছাড়া হবে কি?
“বুড়ো হাতি ওড়ে” ব’লে কেউ যদি গালি দেয়?
কান টেনে ল্যাজ ম’লে “দুয়ো” ব’লে তালি দেয়?
কেউ যদি তেড়েমেড়ে বলে তার সামনেই—
“কোথাকার তুই কেরে, নাম নেই ধাম নেই?”
জবাব কি দেবে ছাই, আছে কিছু বলবার?
কাঁচুমাচু ব’সে তাই, মনে শুধু তোলপাড়—
“নই ঘোড়া, নই হাতি, নই সাপ বিচ্ছু
মৌমাছি প্রজাপতি নই আমি কিচ্ছু।
মাছ ব্যাঙ গাছপাতা জলমাটি ঢেউ নই,
নই জুতা নই ছাতা, আমি তবে কেউ নই!”
।। সমাপ্তি ।।