Bong Long Reader

Bong Long Reader

❂❂❂ Free Book Library ❂❂❂

(329 Items)

বিদ্যুৎ মৎস্য-সুকুমার রায়

এক-একরকম জানোয়ারের এক-একরকম অস্ত্র। কেউ শিং দিয়ে গুঁতায়, কেউ নখ দিয়ে আঁচড়ায়, কেউ দেয় দাঁতের কামড়, কেউ মারে হুলের খোঁচা। ক্যাঙারুর ল্যাজের ঝাপ্‌টা, ঈগলের ধারালো ঠোঁট, অস্ত্র হিসাবে এগুলিও বড়ো কম নয়। কিন্তু তার চাইতেও আশ্চর্য অস্ত্র আছে একরকম বান মাছের গায়ে। তোমরা কেউ ‘ব্যাটারির’ ‘শক্’ খেয়েছ কি? কিম্বা খোলা বিদ্যুতের তারে ভুলে হাত দিয়েছ কি? এই মাছকে ধরতে গেলে গায়ের মধ্যে ঠিক তেমনি ধাক্কা লাগে।

➤এই অদ্ভুত মাছকে ইংরাজিতে বলে Electric Eel অর্থাৎ ‘বৈদ্যুতিক ঈল’। বান মাছের মতো চেহারা, সাপের মতো লম্বা, মুখে ধারাল দাঁত—এক-একটি ঈগল পাঁচ-ছয় হাত পর্যন্ত বড়ো হয়। এই জাতীয় মাছ পৃথিবীর নানা স্থানে পাওয়া যায়, কিন্তু যেগুলিতে বিদ্যুতের তেজ দেখা যায় সেগুলি থাকে কেবল আমেরিকার বড়ো-বড়ো নদীর ধারে-কাছে। এক-একটা ঈলের এমন আশ্চর্য তেজ, তারা বিদ্যুৎ চালিয়ে অন্য মাছদের তো মেরে ফেলেই, এমনকি, বড়ো-বড়ো জানোয়ারগুলোকেও এক-এক সময় তারা অস্থির করে তোলে। গোরু, ঘোড়া পর্যন্ত কত সময়ে জল খেতে নেমে ঈলের পাল্লায় পড়ে যন্ত্রণায় লাফালাফি করতে থাকে। সেদেশের লোকেরা রীতিমতো বর্শা বল্লম নিয়ে এই মাছ শিকার করে, কারণ, কোনোরকমে তার গায়েগা ঠেকলেই বড়ো-বড়ো জোয়ান মানুষকেও বাপ্ রে মা রে করে চেঁচাতে হয়। একবার কতগুলো ঘোড়া একটা বিলের মধ্যে জল খেতে গিয়েছিল। সেখানে প্রায় চল্লিশ-পঞ্চাশটা বড়োবড়ো ঈল এক জায়গায় জড়ো হয়েছিল। ঘোড়াগুলো তার মাঝখানে পড়েই চীৎকার করে লাথি ছুঁড়ে ডাঙায় পালিয়ে আসল। কিন্তু একটা ঘোড়া তার মধ্যে একটু বেশি কাহিল হয়েছিল, সেটা অনেকক্ষণ পর্যন্ত জলের ধারে আধমরা অবস্থায় পড়েছিল। ঈলগুলোও অবশ্য লাথির চোটে সেখানে বেশিক্ষণ টিকতে পারে নি।

➤এই সাংঘাতিক অস্ত্র এরা কেমন করে ব্যবহার করে, আর কেমন করে তাদের শরীরের মধ্যে এতখানি বিদ্যুৎ সঞ্চিত হয়, তা এখনো পণ্ডিতেরা খুব স্পষ্ট করে বলতে পারেন নি। মাছটাকে ধরে চিরলে পরে দেখা যায়, তার শিরদাঁড়ার দুই পাশে পিঠ থেকে ল্যাজ পর্যন্ত ছোটোছোটো কোষ, তার মধ্যে একরকম আঠালো রস; এইটিই তার বৈদ্যুতিক অস্ত্র। অস্ত্রের ব্যবহার করতে হলে সে কেবল তার শরীরটাকে বাঁকিয়ে ল্যাজ আর মাথা শক্রর গায়ে ঠেকিয়ে দেয়। কয়েকবার ক্রমাগত অস্ত্রের ব্যবহার করলে মাছটা আপনা থেকেই কেমন নির্জীব হয়ে পড়ে—তখন আর তার বিদ্যুতের তেজ থাকে না। কিন্তু খানিকক্ষণ বিশ্রাম করলে আবার তার তেজ ফিরে আসে। সব সময়ে যে ইচ্ছা করে সে খামকা অস্ত্র ব্যবহার করে, তা নয়; কোনোরকমে ভয় পেলে বা চমকালেও তার গায়ে বিদ্যুৎ খেলে।

➤এরকম বৈদ্যুতিক শক্তি আরো কোনো কোনো মাছের ও অন্য জলজন্তুর মধ্যেও দেখা যায়। আফ্রিকায় মাগুর জাতীয় একরকম মাছ আছে, তারও তেজ বড়ো কম নয়।–

➤তার সমস্ত শরীরটাই যেন বিদ্যুতের কোষে ঢাকা। একটা চৌবাচ্চায় অন্যান্য মাছের সঙ্গে একে রাখলে তবে এর মেজাজের পরিচয় পাওয়া যায়। দুদিন না যেতেই দেখবে যে আর সব মাছকে মেরে সে সাবাড় করেছে। আফ্রিকার আরবেরা এর নাম বলে ‘রাদ্’ অর্থাৎ বজ্র মাছ।

 

সন্দেশ-আষাঢ়, ১৩২৪

error: Content is protected !!
Scroll to Top